শিরোনাম
◈ এবার ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের যে সুখবর দিলেন ভারপ্রাপ্ত এমডি! ◈ লন্ডন থেকে যাত্রাপথে দুবাইয়ে এআই ফেস রিকগনিশনে ধরা পড়লেন বেনজীর! শনাক্তকরণ নিয়ে চাঞ্চল্য ◈ দুবাইয়ে গ্রেফতার সাবেক আইজিপি বেনজীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে: দুদক ◈ জামায়াতের দুই নারী সদস্যকে নিয়ে মন্তব্য করায় আবারও উত্তপ্ত সংসদ (ভিডিও) ◈ নারী টি-‌টো‌য়ে‌ন্টি বিশ্বকাপে সুন্দর সূচনা বাংলাদেশের ◈ বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশের পাঁচ জেলায় নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ার সিদ্ধান্ত ◈ বিশ্বকা‌পে জাপা‌নের প্রথম ম‌্যাচ নেদারল্যান্ডসের বিরু‌দ্ধে যে কো‌নো উপা‌য়ে জয় চান কোচ ◈ বিশ্বকা‌পে সেমিফাইনালের গ‌ণ্ডি পার হ‌তে চান মরক্কোর কোচ ◈ সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা, রুলিং দিলেন স্পিকার ◈ দুবাইয়ে বেনজীর গ্রেফতার, এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য : সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশিত : ১৪ জুন, ২০২৬, ০৭:২৭ বিকাল
আপডেট : ১৪ জুন, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

এআইয়ের পর এখন আলোচনায় এজিআই, তাহলে কি ডিজাইনাররা সত্যিই ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

চারদিকে এখন শুধু এআই নিয়ে শোরগোল। চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা ডাল-ই দেখে আমরা ভাবছি, প্রযুক্তি বুঝি তার শেষ সীমানায় পৌঁছে গেছে। কিন্তু সত্যি বলতে এখন আমরা যা ব্যবহার করছি, তা কেবল এআই মহাসমুদ্রের একটা ক্ষুদ্র অংশ। যাকে বলে ‘ন্যারো এআই’। একে আপনি যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ট্রেইন করবেন, অর্থাৎ প্রশিক্ষণ দেবেন, সে তার বাইরে এক পা-ও নড়তে পারবে না। মিডজার্নি আপনাকে দারুণ একটা ছবি এঁকে দিতে পারে, কিন্তু ওই বেচারা নিজে থেকে বোঝে না ‘ব্র্যান্ডিং’ জিনিসটা কী!

তাই আসল খেলা এখনো শুরুই হয়নি। খেলা জমবে তখন, যখন বাজারে আসবে এজিআই (আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা সার্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)।

সহজ করে বললে, এজিআইয়ের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। একজন মানুষ যেভাবে একই সঙ্গে রান্না, গাড়ি চালনা বা নতুন ভাষা শেখার মতো একদম ভিন্ন ভিন্ন কাজ করতে পারে; এজিআইও ঠিক তা–ই। এখন একটা ব্র্যান্ডিং করতে গেলে কী হয়? পারপ্লেক্সিটি দিয়ে গবেষণা হয়, চ্যাটজিপিটি দিয়ে লেখা হয় কপি। মিডজার্নি দিয়ে ছবি তৈরি করে ক্যানভা বা অ্যাডোবি ফায়ারফ্লাই দিয়ে হয় ডিজাইন। আলাদা আলাদা টুল, আলাদা মানুষ। কিন্তু এজিআই এলে এই পুরো ‘মাল্টিটাস্কিং’সে একাই সামলাবে। নিজে নিজে শিখবে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তার মধ্যে একটা ‘কমন সেন্স’ বা কান্ডজ্ঞান কাজ করবে, যা এখন পর্যন্ত কেবল মানুষের একচেটিয়া সম্পত্তি।

এআই বনাম এজিআই

এখন যে আমরা এআই নিয়ে এত মেতে আছি, একটু তলিয়ে দেখলে বুঝবেন, এর আদতে সীমাবদ্ধতা অনেক। এর নিজস্ব কোনো মনমানসিকতা বা আত্মা নেই। আপনি ওকে লাখ লাখ ছবি আর ডেটা গিলিয়ে দিলেন, সে ওগুলোর প্যাটার্ন মুখস্থ করে এদিক-সেদিক জোড়াতালি দিয়ে আপনাকে নতুন কিছু একটা বানিয়ে দিল—ব্যস, এই! ও কিন্তু নিজেই জানে না ও আদতে কী বানাল। এর পেছনে যে একটা বিমূর্ত ভাবনা বা আসল মানবিক আবেগ থাকে, সেটা বোঝার ক্ষমতা এই ডিপ লার্নিং মডেলগুলোর নেই।

এত সীমাবদ্ধতা থাকার পরও এই জেনারেটিভ এআই আমাদের চেনা জগৎটাকে ওলটপালট করে দিচ্ছে! পরিসংখ্যান দেখলে মাথা ঘুরে যায়। স্রেফ ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যেই টেক্সট-টু-ইমেজ অ্যালগরিদম দিয়ে দুনিয়ায় প্রায় দেড় হাজার কোটি ছবি তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন নাকি গড়ে ৩ কোটি ৪০ লাখের বেশি ছবি তৈরি হচ্ছে! আরেক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৮৩ শতাংশ ভিজ্যুয়াল ক্রিয়েটিভ বা ডিজাইনার এরই মধ্যে তাঁদের কাজের কোনো না কোনো পর্যায়ে এআইয়ের কাছে ‘একটু হেল্প’নেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। এই সংখ্যাটা কমার কোনো লক্ষণ তো নাই-ই, রকেটের গতিতে কেবল বাড়ছেই।

বর্তমানে গুগল, ওপেনএআই, মেটা ও অ্যানথ্রপিকের মতো শীর্ষস্থানীয় টেক জায়ান্টরা হন্যে হয়ে এজিআই তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। যদিও এটি এখনো পুরোপুরি তাত্ত্বিক (থিওরিটিক্যাল) পর্যায়ে আছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ি এই প্রযুক্তি আমাদের দরজায় কড়া নাড়বে।

ডিজাইনের ধারনায় বড় ধাক্কা

শুধু প্রম্পট লিখে একটা সুন্দর বিড়ালের ছবি বানানোর চেয়ে এজিআই বহুগুণ শক্তিশালী। ধরুন, এজিআই কোনো কোম্পানির বাজেট, টার্গেট অডিয়েন্স আর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে চোখের পলকে লোগো থেকে শুরু করে কালার প্যালেট, টাইপোগ্রাফিসহ পুরো ব্র্যান্ড গাইডলাইন নামিয়ে দিল। যে কাজে এখন একজন ডিজাইনারের কয়েক সপ্তাহ আর কয়েক লিটার কফি লাগে, সেটাই হবে মিনিটে!

আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবুন—‘লাইভ ডিজাইন’। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা বিজ্ঞাপন কেমন কাজ করছে, মানুষের সাড়া কেমন, সেই রিয়েল-টাইম (তাৎক্ষণিক) ডেটা যাচাই করে এজিআই নিজে থেকেই লে–আউট বা টেক্সটের রং বদলে দেবে সর্বোচ্চ রিচ পাওয়ার জন্য।

একজন মানুষের পক্ষে একই সঙ্গে লোগো ডিজাইন, থ্রি–ডি অ্যানিমেশন, ইউজার ইন্টারফেস আর মোশন গ্রাফিকসে সমান পারদর্শী হওয়া কঠিন। কিন্তু এজিআইয়ের জন্য এটা ডালভাত। সে স্থির লোগো বানাবে, সেটাকে থ্রি–ডিতে রূপান্তর করবে, আবার অ্যাপের চেহারাও (ইন্টারফেস) ডিজাইন করে ফেলবে। এমনকি ক্লায়েন্টের সেই চিরন্তন গোলমেলে চাওয়া—‘ভাই, একটু গর্জিয়াস কিন্তু মিনিমাল কিছু করে দেন’–এরও সমাধান আছে এজিআইয়ের কাছে। সে ক্লায়েন্টের সঙ্গে সরাসরি চ্যাট করে মতামত নেবে এবং চোখের পলকে ডিজাইনের শত শত ধরন (ভ্যারিয়েশন) তৈরি করে স্ক্রিনে ছুড়ে মারবে।

বাংলাদেশের কী হাল

বাংলাদেশে এখন ডিজাইনার বা এজেন্সিগুলো এআই ব্যবহার করছে ঠিকই, কিন্তু তা খুবই প্রাথমিক স্তরে। সবচেয়ে বড় গলদ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সিলেবাসে এখনো এআই প্রযুক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আর তার চেয়ে বড় সংকট—নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৌলিক কাজ করার খাটনি ও তাত্ত্বিক পড়াশোনার প্রতি একধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। শর্টকাটে ডিজাইনার হওয়ার চক্করে এটাই তাদের সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে দিচ্ছে।

মিথ্যা সান্ত্বনা দেব না। এআই এসে গ্রাফিক ডিজাইনারদের পায়ের নিচের মাটি কিছুটা হলেও কাঁপিয়ে দিয়েছে, এটা সত্যি। তাই বলে কি ডিজাইনারদের পুরো জাতটাই ডাইনোসরের মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে? না, ব্যাপারটা এত সোজা নয়। আসলে এআই এসে আমাদের চাকরিটা পুরোপুরি কেড়ে নিচ্ছে না, বরং ডিজাইন পেশার পুরো চরিত্রটাই বদলে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগছে একদম নিচের স্তরে। যাঁরা এত দিন শুধু রেডিমেড টেমপ্লেট কাস্টমাইজ করতেন, কিংবা মোটামুটি মানের সাধারণ লোগো-ব্যানার বানিয়ে টুকটাক ফ্রিল্যান্সিং করতেন, তাঁদের বাজার কিন্তু শেষ। এই মেকানিক্যাল আর পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো এখন এআই চোখের পলকে করে দিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এই পর্যায়ের ‘কপি-পেস্ট’ চাকরির সুযোগগুলো হু হু করে কমছে।

ক্লায়েন্টরা এখন ভাবছে, ‘আরে, এআই দিয়ে যখন এত কম খরচে কাজ হচ্ছে, তাহলে ডিজাইনারকে এত টাকা দেব কেন?’ ব্যস, অমনি ডিজাইন সেবার বাজারমূল্য ধপাস করে পড়ে গেল। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোয় এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা আর আন্ডারপ্রাইসিং (কম মজুরি)। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে নতুনদের। জুনিয়ররা যদি ছোটখাটো কাজ করে হাত পাকানোর সুযোগই না পায়, তবে তারা অভিজ্ঞতা পাবে কী করে!

আরেকটা জিনিস খেয়াল করেছেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করলেই এখন একই ধরনের ‘প্লাস্টিক মার্কা চেহারা’র এআই জেনারেটেড ডিজাইন চোখে পড়ে। সব দেখতে নিখুঁত, কিন্তু কেমন যেন প্রাণহীন, তাতে কোনো গল্প নেই। এই একঘেয়েমির কারণে মৌলিকতা আর সত্যিকারের সৃজনশীলতার বৈচিত্র্যটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এখানেই একটা আশার আলো আছে। দিন শেষে এআই তো একটা অ্যালগরিদমমাত্র। মানুষের গভীর কোনো অনুভূতি, একটা সাংস্কৃতিক সমসাময়িকতা বা সূক্ষ্ম সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া, একটি ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজি—এগুলোর ধারেকাছেও এআই এখনো পৌঁছাতে পারেনি। তাই যাঁরা শুধু সফটওয়্যার চালানোকে ডিজাইন ভাবতেন, বিপদটা আদতে তাঁদেরই।

এজিআইয়ের যুগে টিকে থাকার মন্ত্র

উপায় একটাই—টুলস বা সফটওয়্যারে নয়, জোর দিন আপনার মগজে। আমাদের দেশে চারুকলার বাইরে অনেক ডিজাইনার ও ফ্রিল্যান্সার আছেন, যাঁরা ভাবেন একাডেমিক শিক্ষা ছাড়া এই ফিল্ডে ভালো করা যাবে না। কথাটি একদম ঠিক নয়। নিজের চেষ্টা, সঠিক মেন্টরশিপ আর পড়াশোনা থাকলে সবকিছুই সম্ভব। সোজা কথায়, ডিজাইনার এখন আর কেবল খেটে খাওয়া একজন ‘কারিগর’ নন। তাঁর ভূমিকা বদলে যাবে; তাঁকে হতে হবে একজন ‘পরিচালক’ বা একজন জাঁদরেল ‘কৌশলী’।

দিন শেষে আপনার কাজের পেছনে যদি গভীর চিন্তা থাকে, একটা নিজস্ব মৌলিকতা আর মানুষের ছোঁয়া মেশানো খাঁটি আবেগ থাকে, তবে প্রযুক্তির কোনো ঝড়ই আপনাকে সরাতে পারবে না; বরং যেকোনো পরিস্থিতিতেও বাজারে আপনার চাহিদা থাকবে সবার ওপরে, আপনিই হবেন আসল ‘বস’!

এআইয়ের বাজারে টিকে থাকতে হলে যে দক্ষতাগুলো আপনার ঝোলায় থাকা দরকার-

১. মৌলিক কাজ: মাউস ছেড়ে মাঝেমধ্যে হাতে পেনসিল তুলে নিন, স্কেচবুকে হিজিবিজি দাগ কাটুন। প্রকৃতি ও চারপাশ থেকে অনুপ্রেরণা নিন। প্রচুর ভিজ্যুয়াল দেখুন ও বিশ্লেষণ করুন। অন্ধভাবে কপি করা বাদ দিয়ে নিজে সৃষ্টি করুন।

২. পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মূল্যায়ন: এজিআই হয়তো অল্প সময়ে হাজারটা অপশন তৈরি করে দেবে, কিন্তু একটি ব্র্যান্ডের জন্য কোনটা জুতসই, সেই ‘ভিজ্যুয়াল গ্রামার’বোঝার চোখটা আপনার থাকতে হবে। হাজারটা আবর্জনার মধ্য থেকে হীরা খুঁজে বের করার ক্ষমতাই আপনাকে আলাদা করবে।

৩. তাত্ত্বিক জ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব: কালার সাইকোলজি, কনজিউমার বিহেভিয়ার এবং একটি ব্র্যান্ডের গল্প ফুটিয়ে তোলার তাত্ত্বিক জোর বাড়াতে হবে। এর জন্য প্রচুর পড়াশোনা আর গবেষণার কোনো বিকল্প নেই।

৪. মানুষ ও কম্পিউটারের মিথস্ক্রিয়া: এজিআই ইন্টারফেস বানাতে পারে, কিন্তু মানুষ সেটা ব্যবহার করার সময় কেমন অনুভব করছে, তা কেবল মানুষই বুঝবে। তাই ‘ইউজার এক্সপেরিয়েন্স’ নিয়ে পড়াশোনা বাড়াতে হবে।

৫. এআই টুলসকে নিজের সহকারী বানান: এআই টুলস শেখার বিকল্প নেই। মন খারাপ না করে একে নিজের সহকারী হিসেবে কাজে লাগান। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও টুলস শেখায় জোর দিন। নানা ধরনের কাজ করতে পারদর্শী হয়ে উঠুন।

৬. আধুনিক প্রযুক্তি: স্ক্রিন এখন আর টু–ডি-তে আটকে নেই। অগমেন্টেড রিয়েলিটি ও ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটির জন্য থ্রি–ডি মডেলিং বা স্পেশাল ডিজাইনের প্রাথমিক ধারণা থাকা জরুরি।

সূত্র: প্রথম আলো

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়