নোয়াখালী প্রতিনিধি : নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া উপজেলার জাহাজমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (আইসি) খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে এক কিশোরীকে (১২) ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় পুলিশ ও তাদের পেষোয়াদের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ভুক্তভোগীর পরিবারটি। গত কয়েক মাস আগে এই ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করে এর কোনও প্রতিকার পাননি বলে জানান তারা।
শনিবার ভুক্তভোগী কিশোরী ও তার মায়ের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণসহ একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ পরিদর্শক খোরশেদ আলমকে জাহাজমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী কিশোরীর মা ও ভাই জাহাজমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের মেসে রান্নাবান্নার কাজ করার সুবাদে কিশোরীও সেখানে মাঝেমধ্যে যাতায়াত করতো। ভুক্তভোগী কিশোরী জানায়, সে যখন স্কুলে বা বিকালে দোকানে যেতো, তখন খোরশেদ আলম তদন্ত কেন্দ্রের পাশের রাস্তার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে প্রায়ই বাসার তিনতলার ব্যালকনি থেকে ডাকতেন। প্রথম দিকে ভুক্তভোগী ভয়ে যেতো না। পরবর্তীতে বাসার ঘর ঝাড়ু দেওয়া, কাপড় ধোয়া এবং বিছানা ঠিক করার অজুহাতে ডেকে নেওয়া হতো। বাসায় ডেকে নিয়ে খোরশেদ আলম তাকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। কিশোরী এতে বাধা দিলে তাকে ও মাকে একেবারে মেরে ফেলার হুমকি দেন। ধর্ষণের পর তাকে মুখ বন্ধ রাখার জন্য ৫০০ বা ১০০০ টাকা দিয়ে বিদায় করা হতো এবং 'মোবাইল' কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হতো।
লোকলজ্জা ও সামাজিক মানসম্মানের ভয়ে ভুক্তভোগী প্রথমে বিষয়টি কাউকে জানায়নি উল্লেখ করে বলেন, সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি বিকালে কিশোরীর মা খোরশেদ আলমের বাসার দরজার সামনে গিয়ে ভুক্তভোগীকে ডাকলে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ধমক দিয়ে বাথরুমে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করেন এবং তার মাকে মিথ্যা কথা বলে বিদায় করে দেন। পরবর্তীতে রাতে মা তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করলে কিশোরী সব সত্য ঘটনা খুলে বলেন।
কিশোরীর মা বলেন, আমার মেয়েকে ধর্ষণের বিষয়টি আমরা পুলিশের হাতিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারকে জানিয়েছিলাম। এ বিষয়ে তার কাছে লিখিত জবানবন্দিও দিয়েছি। কিন্তু তিনি টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছেন। স্থানীয় রাকিব ও স্বর্ণকার কবির নামে দুই জন পুলিশের পক্ষ নিয়ে আমাদের থেকে জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছিল। আমরা এখন ভয়ে বাড়িতে যেতে পারি না। গত চার মাস ধরে আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে আইসি খোরশেদ আলমের বক্তব্য জানা যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, অনেক আগে এ ধরনের একটি অভিযোগ উঠেছিল। তখন এই অভিযোগের ভিত্তিতে হাতিয়া সার্কেল কর্মকর্তা একটি তদন্ত করেছিলেন। তদন্তে এর সত্যতা মেলেনি বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু আজ আবার এই ধরনের একটি ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বর্তমানে কোনও লিখিত কিংবা মৌখিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী কিশোরী কিংবা তার পরিবারের পক্ষ থেকেও আমার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা হয়নি।
নোয়াখালী জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনা সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে।