সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে ১৭ হাজার কিলোমিটার সাইকেলে চেপে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটিতে পৌঁছে গেছেন লিওনেল মেসিদের তিন পাগল ভক্ত। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমীও পৌঁছে গেছেন কাক্সিক্ষত গন্তব্যে-বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুতে, ফিফার ফ্যান ফেস্টে, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার বিভিন্ন শহরে। ফুটবলাররা প্রস্তুত। সমর্থকরাও প্রস্তুত।
প্রস্তুত ফুটবলযজ্ঞের মঞ্চও। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইলটন স্যাম্পাইও বাঁশিতে ফুঁ দিলেই শুরু হবে বিশ্বকাপ। মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বিশ্বে উত্তাপ ছড়ানো এক ফুটবলীয় লড়াই।
চার বছরের অপেক্ষার অবসান। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি এখন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজটেকা স্টেডিয়ামের দিকে। বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠছে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের। ৪৮ দল নিয়ে সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু হবে ফুটবল ইতিহাসের বহু স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী আজটেকা স্টেডিয়ামে। পেলের ১৯৭০, ম্যারাডোনার ১৯৮৬-দুটি বিশ্বকাপই এ স্টেডিয়ামকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা।
বিশ্বকাপ মানেই শুধু ফুটবল নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবগুলোর একটি। প্রতি চার বছর পর পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ভাষা, সংস্কৃতি ও সীমান্তের বিভেদ ভুলে একত্রিত হয় একটি বলের পেছনে। সেই মহোৎসবের নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে আজটেকায়।
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের পথচলা। ১৩ দল নিয়ে যাত্রা শুরু করা টুর্নামেন্টটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসরে পরিণত হয়েছে। প্রায় এক শতাব্দীর এই যাত্রায় বিশ্বকাপ জন্ম দিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তির। পেলের উত্থান, ম্যারাডোনার জাদু, জিনেদিন জিদানের শিল্প, রোনালদোর গতি, মেসির স্বপ্নপূরণ-সবই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ।
এবারের বিশ্বকাপ সেই ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮ দল অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে। ম্যাচের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তিও। ফুটবল বিশ্বের অনেক নতুন দেশ এবার সুযোগ পেয়েছে নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর। ফিফার আশা, বিশ্বকাপের এই সম্প্রসারণ ফুটবলকে আরও বেশি বৈশ্বিক করে তুলবে। কেপ ভার্দে, জর্ডান, উজবেকিস্তান ও কুরাসাও নতুন দল হিসেবে অংশ নিচ্ছে। নতুন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে খেলছে মরক্কোর মতো দলও।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্যও বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আয়োজক দেশ মেক্সিকো তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে তুলে ধরতে চায় বিশ্বমঞ্চে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করবেন। সংগীত, নৃত্য, আলো আর প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বর্ণাঢ্য আয়োজন। পপ স্টার শাকিরাসহ অনেক সংগীত শিল্পীই ফুটবলের আনন্দ শুরু করবেন নেচে-গেয়ে। আলোক প্রদর্শনী ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই চমক দেখাতে যাচ্ছে মেক্সিকো। বিশ্বকাপের উদ্বোধনের জন্য আজটেকা স্টেডিয়ামকে বেছে নেওয়ার মধ্যেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু মুহূর্তের সাক্ষী এ স্টেডিয়াম। ১৯৭০ সালে এখানে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন পেলে।
১৯৮৬ সালে এ মাঠেই ম্যারাডোনা খেলেছিলেন তার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র ম্যাচ। সেই ঐতিহাসিক ভেন্যুতেই শুরু হচ্ছে নতুন আরেক বিশ্বকাপের উন্মাদনা। এ উন্মাদনায় শেষ উৎসব করবে কারা? ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, নাকি ইউরোপীয় শক্তি স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি কিংবা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল? নজর থাকবে নতুন প্রজন্মের তারকাদের ওপরও। লামিন ইয়ামাল, জুড বেলিংহাম, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আরলিং হলান্ড, ভিনিসাস জুনিয়রদের জন্য এটি হতে পারে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। এমবাপ্পে তরুণ বয়সেই বিশ্বকাপ জিতে খ্যাতির শিখরে পৌঁছেছেন। তবে এবারের বিশ্বকাপ তাকে কিংবদন্তির মর্যাদায় আরও এক ধাপ এগিয়ে দিতে পারে। লিওনেল মেসি ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপটি নিশ্চয়ই রাঙাতে চাইবেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্যও এটি শেষ সুযোগ। বড় বড় তারকা ও ফুটবল শক্তির ভিড়ে ‘ডার্ক হর্স’ খ্যাত দলগুলোর কথাও মনে রাখতে হবে। বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস কিংবা মরক্কোর মতো দল চমকে দিতেই পারে ফুটবল বিশ্বকে। বিশ্বকাপ শুধু শিরোপার লড়াই নয়, এটি আবেগেরও লড়াই। প্রতি আসরেই জন্ম নেয় নতুন নায়ক। আবার ভেঙে যায় অনেক স্বপ্ন। কোনো অখ্যাত দল হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, কোনো তারকা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন কিংবদন্তির কাতারে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আকর্ষণই হলো এই অনিশ্চয়তা। ২০২৬ সালের আসর আরও একটি কারণে বিশেষ। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ-মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো।
আয়োজন, দর্শকসংখ্যা এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ বলেই মনে করা হচ্ছে। আগামী এক মাস ফুটবলের জ্বরে কাঁপবে বিশ্ব। রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, ক্যাফেটেরিয়া, অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়-সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে বিশ্বকাপ। কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ ও প্রত্যাশা মিশে যাবে এক মহাযজ্ঞে। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেই মহাযজ্ঞের বাঁশি বাজছে আজটেকায়। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা, কে লিখবেন নতুন ইতিহাস? কে ছুঁয়ে দেখবেন সোনালি ট্রফি? আর কার নাম যুক্ত হবে বিশ্বকাপের অমর কিংবদন্তিদের তালিকায়?