মনিরুল ইসলাম: আগামীকাল জাতীয় সংসদে নতুন সরকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হতে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন। বড় আকারের এই বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির ওপরই জোর দিচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় অর্ধেক বা ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট থেকে আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ভ্যাট বৃদ্ধির মানে হলো, ধনী-গরিব সবার ওপর এটি ধার্য হবে। করজাল সম্প্রসারণের অংশ হিসাবে খুচরা পর্যায়ে কর আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পণ্য সরবরাহের পর্যায়ে প্রতি হাজারে ২ টাকা হারে উৎসে কর কাটা হবে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ হলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেয় সাড়ে ৫ লাখের মতো। এই সংখ্যা এক বছরের মধ্যে ২০ লাখে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে এনবিআরবহির্ভূত রাজস্ব আহরণ প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে ৯১ হাজার কোটি টাকা করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাসপোর্ট, যানবাহনের লাইসেন্স ও বিভিন্ন সেবামূলক খাত থেকে এই অর্থ আসবে, যা সেবার ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। ব্যক্তিশ্রেণির সর্বোচ্চ করহার ৩০ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। সুদ পরিশোধেই ব্যয় হতে পারে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা, যা বাজেটের বড় একটি অংশ দখল করবে। বিপুল পরিমাণ সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে, যার চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। মূল্যস্ফীতি আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে এটি সাড়ে ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন উচ্চপর্যায়ে থাকায় নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও ডলারের উচ্চমূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতায় সেই সুবিধা পুরোপুরি ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সার, ওএমএস ও ফ্যামিলি কার্ডে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে খাদ্যে ভর্তুকি কমিয়ে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে প্রণোদনা ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ ৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর অংশ হিসাবে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, যেখানে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। মোট ১ কোটি ২১ লাখ মানুষকে বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৪ লাখ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে। তবে শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার।
নিত্যপণ্যে কর ছাড়, নতুন পে-স্কেল ও সোনার ভরিতে ভ্যাট কমানো এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলেও, অর্থনীতিবিদরা ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি ও রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ে চিড়েচ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে একটু স্বস্তির প্রহর গুনছেন। সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভ্যাট ও করের যে জাল বিস্তারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তাতে মানুষের সেই প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হবে তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিত্যপণ্যের দাম নাগালে আনতে না পারলে সামাজিক সুরক্ষার এই উদ্যোগগুলোও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রকৃত স্বস্তি ফেরাতে পারবে না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) মনে করে, আগামী বাজেটে অর্থনীতির প্রধান সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার মতো সুর্নিদিষ্ট প্রদক্ষেপ থাকতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে হবে। স্বল্প আয়ের মানুষরা যেন স্বস্তিতে থাকতে পারে সেজন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে। নির্বাচনি ইশতেহারের আলোকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।
এই প্রতিষ্ঠানের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে আনার মতো প্রদক্ষেপ বাজেটে না থাকলে সেটা জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। জিডিপির অনুপাতে বাজেটের আকার আরও বড় করার সুযোগ আছে, তবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি না পেলে সেটা টেকসই হবে না। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মতো কর্মসূচি ভালো উদ্যোগ, কিন্তু সেটি প্রকৃত উপকারভোগীর হাতে পৌঁছাতে হবে।
এদিকে, কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আদায়ে বেশ বড়সড় ঘাটতি হচ্ছে। তাই প্রতিবারের মতো আগামী বাজেটেও শুল্ক-কর আদায়ে মরিয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কারণ, বাজেটের বাড়তি খরচের জোগান দিতে হবে তাদের। একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন বাস্তবায়ন শুরু হবে ১ জুলাই। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার এক লাখ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে এক লাখ কোটি টাকা বাড়িয়ে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুল্ক-কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কিছু ক্ষেত্রে বাড়তে পারে।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে। আবার ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হতে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে উদ্যোক্তাদের জন্য নানা খাতে করছাড়ও রাখা হতে পারে আগামী বাজেটে। তবে খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতার ওপর অগ্রিম কর বসতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক-কর কমবে। মূল্যস্তর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলে সিগারেটের দাম বাড়তে পারে।
এ ছাড়া নিয়মনীতিগুলো ব্যবসাবান্ধব করতে ‘ডি-রেগুলেশন’ নিয়ে বাজেট বক্তৃতায় একটি অনুচ্ছেদ রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। সেখানে ব্যবসার লাইসেন্স ও নবায়নের মেয়াদ পাঁচ বছর করা হতে পারে।