শিরোনাম
◈ ব্যভিচার ও প্রতারণার মামলায় খালাস পেলেন নাসির হোসেন ও তামিমা ◈ এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ঠেকাতে সাইবার আইনে নতুন শাস্তির বিধান ◈ প্রতিবাদ: বিশ্বকাপ ফুটবলে ইরানী খে‌লোয়াড়‌দের জার্সিতে লেখা #168! লজ্জায় মুখ ঢাকবে আমেরিকা  ◈ বাজেটে স্বস্তি ও চ্যালেঞ্জ দুটোই, করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৩.৭৫ লাখ টাকা ◈ ময়মনসিংহে ট্রেন লাইনচ্যুত, ঢাকা-জামালপুর রুটে চলাচল বন্ধ ◈ বিশ্বকা‌পের শেষ প্রস্তু‌তি ম‌্যা‌চে আইসল‌্যান্ড‌কে ৩-০ গো‌লে হারা‌লো আ‌র্জেন্টিনা, মাঠে ফি‌রেই মেসির গোল ◈ বাজুসের নতুন ঘোষণা, দেশের বাজারে কমলো স্বর্ণের দাম ◈ 'এই সময়' কে দেয়া সাক্ষা‌তকা‌রের দ্বিতীয় পর্ব-- টুঙ্গিপাড়ায় চলে যাবো বলে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, আমি জানতামই না, দেশের বাইরে যাচ্ছি: শেখ হা‌সিনা ◈ লাল টেলিফোনের পর এবার প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ল্যাপটপ চুরি, নিরাপত্তা সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ◈ ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের দুই স্টেডিয়ামের পিচ নিয়ে অসন্তুোষ আইসিসির

প্রকাশিত : ০৪ মার্চ, ২০২৬, ০৮:৪৬ সকাল
আপডেট : ০২ জুন, ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কাশ্মীর নিয়ে যেভাবে ভারতকে বাঁচিয়েছিল ইরান

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরান আক্রমণ ও সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা নিয়ে নয়াদিল্লির ‘অস্বস্তিকর’ নীরবতায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আলোচনা চলাকালীন এক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ও গুরুতর ফাটল।

খামেনিকে হত্যা এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি নির্বিচার আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো শোকপ্রকাশ করেননি। সামরিক হানার নিন্দাও করেননি। এই নীরবতার সমালোচনা করতে গিয়ে সোনিয়া ওই নিবন্ধে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান যখন ১৯৯৪ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে (ওআইসি) জোটবদ্ধ করে কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছিল, এই ইরানই তখন ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে তা বানচাল করে দিয়েছিল। কাশ্মীর সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকাতে ইরান সেদিন ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের সেই ভূমিকা ছিল অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার নিন্দা তো দূরের কথা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখনো শোক জ্ঞাপন পর্যন্ত করেননি। এই নীরবতা সোনিয়া গান্ধীকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা ভারত যদি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেও ঠিক মুহূর্তে যদি বৃহৎ শক্তির জবরদস্তির বিরুদ্ধে সরব না হয়, তা হলে অন্যদের কাছেও ভারত তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আস্থা হারাবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর।

সোনিয়া খুবই সংক্ষেপে ১৯৯৪ সালের ভারতীয় কূটনীতির জয়ের প্রসঙ্গ টানলেও সে সময় যা ঘটেছিল, তা রীতিমতো থ্রিলার। ভারতীয় কূটনৈতিক সাফল্যের সে ছিল এক অভিনব দৃষ্টান্ত।

তার ঠিক আগের বছর দ্বিতীয়বারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। ১৯৯৪ সালে তিনি উদ্যোগী হন ওআইসিকে জোটবদ্ধ করে কাশ্মীরে মানবাধিকার হরণ ও লঙ্ঘন নিয়ে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে তা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে পেশ করার। প্রস্তাবটি পাস হলে বহু দশক পর কাশ্মীর সমস্যা আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। আলোচিত হতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন নরসিমা রাও। দুই বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ঠেকাতে না পেরে তিনি তখন সমালোচনার কেন্দ্রে। বেহাল অর্থনীতি সামাল দিতে সোনা বন্ধক রাখা ভারত তখনো টালমাটাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চিরবন্ধু রাশিয়াও তখন থিতু নয়। এ অবস্থায় নরসিমা রাও বাজি ধরেছিলেন ইরানের ওপর। তিনি বুঝেছিলেন, ইরান রাজি না হলে সর্বসম্মতির অভাবে ওআইসি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনেও প্রস্তাবটি পেশ হবে না। কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকীকরণের পাকিস্তানি স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।

নয়াদিল্লির ইরান দূতাবাস পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের এই প্রচেষ্টা আন্দাজ করতে পারেনি। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরানের রাষ্ট্রদূত কাশ্মীরের হুরিয়ৎ নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ওআইসিতে প্রস্তাব পাস করাতে ইরান যথাসাধ্য করবে। নরসিমা রাও কীভাবে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, কাদের সাহায্য তিনি নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বরেণ্য নেতারা কীভাবে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে সবার অলক্ষে কীভাবে কয়েক ঘন্টার জন্য তেহরান ঘুরে দিল্লি ফিরে এসেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং, সেই রোমহর্ষ কাহিনি টুকরা টুকরাভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে অভিষেক চৌধুরীর লেখা অটল বিহারি বাজপেয়ীর জীবনী ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য়। ইরানবিশেষজ্ঞ সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এম কে ভদ্রকুমারও সেই থ্রিলার স্মৃতিচারণা করেছেন।

নরসিমা রাও যখন ঠিক করলেন, ওআইসিকে ঠেকাতে একমাত্র ইরানই হতে পারে তুরুপের তাস, সেই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং অসুস্থ অবস্থায় দিল্লির অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। দিল্লিতে শীতের কামড়ের তীব্রতা কমলেও তেহরান তখনো বরফের চাদরের তলায়। সেই তীব্র ঠান্ডায় কাকপক্ষীকে জানতে না দিয়ে এইমস থেকে স্ট্রেচারে শুইয়ে বের করা হয় দীনেশ সিংকে। সেনা বাহিনীর বিশেষ বিমানে তিনি তেহরান পৌছান। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে নামিয়ে আনা হয় বিমান থেকে। সফরসঙ্গী একজন চিকিৎসক ও তিনজন সহযোগী। ‘মিশন সাকসেসফুল’ হওয়ার অনেক পরে জানা গিয়েছিল, কৌতূহলী ব্যক্তিদের নজর এড়াতে দিল্লির এইমস হাসপাতালে দীনেশ সিংয়ের বিছানায় সেদিন অন্য একজনকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল।

দীনেশ সিংকে স্বাগত জানাতে তেহরান বিমানবন্দরে প্রটোকল ভেঙে হাজির হয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি। হুইলচেয়ারবন্দী দীনেশ সিংকে দেখে বিস্মিত তিনি সফরের কারণ জানতে চাইলে স্মিত হেসে দীনেশ তাঁর হাতে প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাসেমি রাফসানজানিকে লেখা প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের ব্যক্তিগত অনুরোধপত্রটি তুলে দিয়েছিলেন।

এর পরের কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলায়েতি ও ‘মজলিস’–এর (পার্লামেন্ট) স্পিকার নাতেক নৌরির কাছে কাশ্মীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছিলেন দীনেশ সিং। সন্ধ্যায় দিল্লি ফেরার আগে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের কথা দীনেশ সিংকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে দীনেশ সোজা ফিরে গিয়েছিলেন এইমসে, প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওকে আশ্বস্ত করে। ভদ্রকুমারের কথায়, দীনেশকে রাফসানজানি বলেছিলেন, ভারতের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, ইরান তা নিশ্চিত করবে।

পরের ৭২ ঘণ্টা ছিল টেনশনে ভরা। অবশেষে জানা যায়, ওআইসির প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের প্রস্তাব পেশের সময় ইরান বাধা দেয়। ইরানি প্রতিনিধি জানান, তাঁরা ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই বন্ধু। তাঁরা চান বিবাদের মীমাংসা নিজেদের আলোচনার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। ঔপনিবেশিক শক্তিদের মধ্যস্থতার সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।

সেই তেহরানযাত্রা ছিল দীনেশ সিংয়ের শেষ বিদেশ সফর। পরের বছরের নভেম্বরে ৭০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। নরসিমা রাও অন্য খেলাও খেলেছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতবিরোধীরা তখন সক্রিয়। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রাজনৈতিক বিবাদ ও বিভেদ ভুলে ভারত যে এককাট্টা, তা বোঝাতে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে রাও বেছে নিয়েছিলেন বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ীকে। তাঁর সঙ্গে প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালমন খুরশিদ, জম্মু–কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ এবং অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। জাতিসংঘকে রাও এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন, ভারতীয় গণতন্ত্র বিরুদ্ধস্বর রোধ করে না। প্রত্যেককে সম্মান দেওয়া হয়। এমনকি কাশ্মীরিদের আওয়াজকেও।

জাতিসংঘের আসরে ফারুক আবদুল্লাহর ভাষণ ছিল জ্বালাময়ী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর প্রতি ইঙ্গিত করে আবেগ মিশিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে (বেনজির) কাশ্মীরে আসতে হবে আমার মৃতদেহ ডিঙিয়ে। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি কাশ্মীর রক্ষা করে যাব।

পাকিস্তানের মদদপ্রাপ্ত সশস্ত্র জঙ্গিদের উদ্দেশে হুংকার দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তোমরাই আমাদের সুন্দর দেশকে মৃত্যু উপত্যকা করে তুলেছ। ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য় অভিষেক লিখেছেন, অলৌকিকভাবে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ইরান। তাদের আপত্তিতে কাশ্মীর নিয়ে ওআইসি সর্বসম্মত হতে পারল না। হতচকিত ও বিহ্বল পাকিস্তান প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। ভোটাভুটির প্রশ্নই আর থাকল না।

সেই ভারত ও আজকের ভারতে আসমান–জমিন ফারাক।

আজকের ইরান থেকে ভারতের মুখ ফিরিয়ে থাকা বিস্মিত করেছে সোনিয়া গান্ধীকে। ১৯৯৪ সালে ইরানের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, নীরবতার অর্থ দায়িত্ব এড়ানো। অথচ ভারত চেয়েছিল বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে!

সূত্র: প্রথম আলো

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়