কল্পবিজ্ঞানের মতো শোনালেও দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মস্তিষ্ক ও যন্ত্রের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের উপযোগী চিপ তৈরি করছে ইলন মাস্কের নিউরালিংকসহ বিভিন্ন দেশের একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এ জন্য ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেসেস (বিসিআইএস) প্রযুক্তির তারহীন চিপ তৈরির পাশাপাশি সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে মানুষের মস্তিষ্কে স্থাপনও করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নিউরালিংক যুক্তরাষ্ট্রে অনুমতি না পেলেও নিজেদের দেশে তৈরি মস্তিষ্কে স্থাপনযোগ্য ‘নিও’ নামের চিপকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে চীন। চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিউরাকল টেকনোলজি ও সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এ চিপের অনুমোদন মস্তিষ্কভিত্তিক প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এ অনুমোদনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে চীন আপাতত ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের চেয়ে এগিয়ে গেল। নিউরালিংক বর্তমানে মানুষের ওপর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালালেও নিও ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। মেরুদণ্ডে আঘাতজনিত কারণে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত, তবে হাতের কিছু নড়াচড়ার সক্ষমতা রয়েছে এমন ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের জন্য নিও চিপটি তৈরি করা হয়েছে। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হারিয়ে যাওয়া কিছু শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম চিপটি মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করে সেগুলোকে ডিজিটাল নির্দেশনায় রূপান্তর করতে পারে। পরে সেই নির্দেশনার মাধ্যমে বিভিন্ন যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
নিউরালিংকের চিপের মতো মস্তিষ্কের কর্টেক্সের ভেতরে ইলেকট্রোড স্থাপন করার প্রয়োজন হয় না নিওতে। আকারে একটি মুদ্রার সমান হলেও চিপটিতে আটটি সেন্সর রয়েছে, যা মস্তিষ্ককে ঘিরে থাকা সুরক্ষামূলক আবরণ ‘ডুরা মেটার’-এর ওপর স্থাপন করা হয়। সেন্সরগুলো মস্তিষ্কের সংকেত সংগ্রহ করে একটি কম্পিউটার ব্যবস্থায় পাঠায়। পরে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে ব্যবহারযোগ্য নির্দেশনায় রূপান্তর করা হয়। এসব নির্দেশনার সাহায্যে রোবোটিক গ্লাভসের মতো সহায়ক যন্ত্র পরিচালনা করা সম্ভব হয়, যা ব্যবহারকারীর হাতের নড়াচড়া পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। গবেষকদের মতে, চিপটি সরাসরি মস্তিষ্কের গভীর টিস্যুতে প্রবেশ না করায় অস্ত্রোপচারজনিত ঝুঁকির পরিমাণ বেশ কম। তুলনামূলক নিরাপদ হওয়ার কারণেই চিপটি চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে কয়েক ডজন রোগীর ওপর নিও চিপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। পরীক্ষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা চীনের হেনান প্রদেশের বাসিন্দা ডং হুইকে ঘিরে। ৩৯ বছর বয়সী ডং হুই একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ঘাড়ের নিচের অংশে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে তাঁর শরীরে নিও চিপ প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর কয়েক মাস পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি। প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী এমআইটি টেকনোলজি রিভিউয়ের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের প্রায় এক বছর পর ডং হুই আবার কলম দিয়ে নিজের নাম লিখতে পারছেন।
সূত্র: টেকলুসিভ