দুই সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্থানীয় কনসোর্টিয়াম চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে।
গত ২৮ এপ্রিল 'সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম' নামে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে টার্মিনালটি পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। এর এক মাসেরও বেশি সময় পর বিষয়টি প্রকাশ্যে এল। একই দিনে স্থানীয় আরেক বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এমজিএইচ গ্রুপও এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আলোচনার মধ্যেই দেশীয় এই কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব এনসিটির ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ডিপি ওয়ার্ল্ড দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এনসিটি পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়ে আসছে।
নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া প্রস্তাবের বিষয়টি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে নিশ্চিত করেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি সচল কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটিই সবচেয়ে বড়। গত বছর বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও কনসোর্টিয়ামের পরিচয়
নবগঠিত এই কনসোর্টিয়ামে রয়েছে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) বর্তমান অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড এবং দুই অভিজ্ঞ বার্থ অপারেটর কসমস এন্টারপ্রাইজ ও এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড। কনসোর্টিয়ামের তিন অংশীদারেরই বন্দরে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বহু বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
কনসোর্টিয়ামের দুটি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সাথে দুই সংসদ সদস্যদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান হলেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকার দলীয় হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। অন্যদিকে, এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে ভিন্ন মডেলের প্রস্তাব
ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং এমজিএইচ গ্রুপ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিলেও দেশীয় এই কনসোর্টিয়াম 'সার্ভিস-বেজড' বা সেবা-ভিত্তিক অপারেটিং মডেলের প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, টার্মিনালের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায় পুরোপুরি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) হাতে থাকবে। কনসোর্টিয়ামটি ১৫ বছরের জন্য শুধুমাত্র অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল নিয়োগ এবং জ্বালানি খরচ বহন করবে। এর বিনিময়ে তারা প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ৬৯ ডলার 'অপারেশনাল ফি' দাবি করেছে।
কনসোর্টিয়ামের দাবি, এই ব্যবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে জনবল বা রক্ষণাবেক্ষণ খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না, ফলে আয়ের বড় অংশ বন্দরের হাতেই থাকবে। প্রস্তাবনায় সিবিএ অডিট রিপোর্টের তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, বর্তমানে বন্দর প্রতি কনটেইনারে ১৬১.৮২ ডলার আয় করে এবং ৫৬.১৫ ডলার ব্যয় করে। ফলে নিট আয় থাকে ১০৫.৬৭ ডলার। কনসোর্টিয়ামের মডেলে কোনো বাড়তি বিনিয়োগ ছাড়াই বন্দরের নিট আয় থাকবে প্রায় ৯২ ডলার।
দেশীয় অপারেটররা কতটুকু সফল
প্রস্তাবটিতে স্থানীয় অপারেটরদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, জার্মান পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টিং' এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউএস নির্ধারণ করলেও স্থানীয় অপারেটররা বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩.৩ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং করছে।
সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, 'কনসোর্টিয়ামের তিনটি কোম্পানির চট্টগ্রাম বন্দরে দুই থেকে সাড়ে তিন দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেশীয় কোম্পানি টার্মিনাল পরিচালনা করলে টাকা দেশেই থাকবে। জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে দেশীয় অপারেটরদের সুযোগ দেওয়া উচিত।'
তিনি আরও দাবি করেন, এনসিটির সক্ষমতা বছরে ১৭ লাখ টিইইউএস-এ উন্নীত করা সম্ভব।
সাইফ পাওয়ারটেক ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনা করেছে এবং বর্তমানে সিসিটি পরিচালনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, এনসিটিতে থাকাকালীন তারা ২৩ মিলিয়ন কনটেইনার এবং ১৫ হাজারেরও বেশি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে।
কসমস এন্টারপ্রাইজ ১৯৮৯ সাল থেকে এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস ১৯৮৮ সাল থেকে স্টিভিডোরিং ও বার্থ অপারেশনে নিযুক্ত।
এ বিষয়ে জানতে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাত হোসেন সেলিম ও কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরকারের অবস্থান
একাধিক দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব জমা পড়লেও সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেগুলো বর্তমানে বিবেচনাধীন নেই। এনসিটির ইজারা প্রক্রিয়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে শ্রমিক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়। সম্প্রতি একটি নতুন মূল্যায়ন কমিটি গঠন করে আলোচনা পুনরায় শুরু করেছে সরকার।
নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, 'বর্তমানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা আমাদের অগ্রাধিকার। যেহেতু তাদের সাথে আলোচনা চলছে, তাই এই পর্যায়ে নতুন কোনো প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ নেই। যদি আলোচনা সফল না হয়, তবে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে, যেখানে দেশি-বিদেশি সব অপারেটরদের প্রস্তাব মূল্যায়ন করা হবে।'
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড